white logo top guideline

বাংলাদেশে উদ্যোক্তা উন্নয়নের সম্ভাবনা

বাংলাদেশ বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দরিদ্র দেশ। প্রকট বেকার সমস্যাই এ দারিদ্র্যের প্রধান কারণ। দেশের এক-তৃতীয়াংশ শ্রমশক্তি বেকার। দেশকে বেকারত্বের এই ভয়াবহ সমস্যা থেকে উদ্ধারের জন্য চাকরির বিকল্প হিসেবে ব্যবসায় এবং আত্মকর্মসংস্থানই একমাত্র উপায়। শিল্পোদ্যোগীয় গুণাবলি যাদের রয়েছে তাদেরকে ব্যবসায় স্থাপন ও পরিচালনায় উদ্বুদ্ধ করতে পারলে তারা শুধু নিজেদের কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করবেন না, অধিকন্তু অন্যের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন। এ চিন্তার আলোকে দেখা যেতে পারে বাংলাদেশে ব্যবসায় বা শিল্পোদ্যোগ পেশার উন্নয়নের সম্ভাবনা আছে কি না।

বাংলাদেশে শিল্পোদ্যোগ বিকাশের উজ্জ্বল সম্ভাবনার পটভূমি নিম্নে আলোচনা করা হলঃ

১। শিল্প স্থাপনে উৎসাহ

বাংলাদেশে যেখানে ৪ লক্ষের অধিক ক্ষুদ্র কুটিরশিল্প বর্তমান সেখানে এটি স্পষ্ট যে, সুবিধা ও অনুকূল পরিবেশের অভাবের মধ্যেও এদেশের অনেক মানুষের শিল্পোদ্যোগমূলক চেতনা রয়েছে। কুটিরশিল্প উন্নয়নে এদেশের উদ্দ্যোক্তারা মোট বিনিয়োগের ৮.৫ শতাংশ মাত্র শিল্প ঋণ সুবিধা পেয়ে থাকে। শিল্প স্থাপনে উৎসাহ ও ইতিবাচক চেতনা থাকা সত্ত্বেও মূলধন ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের অভাবে অনেক উৎসাহী উদ্যোক্তা শিল্প স্থাপন করে প্রসার লাভ করতে পারে নি। অতএব, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও ঋণ সুবিধা প্রদান করলে প্রচুর উদ্যোক্তা শিল্প স্থাপনে এগিয়ে আসবে।

২। শিল্পোদ্যোগ চেতনা

বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ব্যবসায় ও শিল্প স্থাপনে শিল্পোদ্যোগীয় মানসিকতা ও সচেতনতাবোধ রয়েছে। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের সংখ্যাগত অবস্থান থেকেই এটা প্রতীয়মান হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের সংখ্যা প্রায় ৪ লক্ষ। এর অধিকাংশই নিজস্ব উদ্যোগে গড়ে উঠেছে। উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা এবং অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা হলে এদেশে ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে।

৩। শিক্ষা ও শিল্পোদ্যোগ

শিক্ষার সাথে শিল্পোদ্যোগের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তাই শিল্প স্থাপন ও পরিচালনার জন্য শিক্ষার বিকল্প নেই। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষার উপর অধিক জোর দেওয়া আবশ্যক। বর্তমানে দেশে কারিগরি শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নিজ উদ্যোগে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা যাবে।

৪। শিল্পনীতি

সরকার কর্তৃক প্রণীত বর্তমান উদার শিল্পনীতি শিল্পোদ্যোগ গ্রহণে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা রাখছে। শিল্প স্থাপনে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও উৎসাহ দান তরুণ উদ্যোক্তাদেরকে উদ্যোগ গ্রহণে উৎসাহিত করছে, যেমন- কর অবকাশ, অঙ্ক হ্রাস, ঋণপ্রাপ্তিতে সহজলভ্যতা ইত্যাদি।

৫। স্থানীয় বাজার

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বৃহত্তর স্থানীয় বাজার শিল্পোদ্যোগ উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। এদেশের স্থানীয় বাজারে উৎপাদিত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ন্যূনতম মান বজায় রেখে পণ্য উৎপাদন করা গেলে এখানে ভোক্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সহজ হবে।

৬। জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন

বাংলাদেশের জাতীয় পরিকল্পনায় পল্লী এলাকার শিল্পায়ন এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনে অধিক গুরুত্ব আরোপের ফলে উদ্যোক্তারা শিল্প স্থাপনে উৎসাহবোধ করছে।

৭। পেশার গতিশীলতা

শিল্পোদ্যোগ উন্নয়নের ক্ষেত্রে পেশার গতিশীলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শ্রমশক্তি যদি কৃষিক্ষেত্র হতে শিল্পক্ষেত্রে স্থানান্তরের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় তাহলে শিল্প স্থাপন ও উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। কৃষিক্ষেত্রে অত্যধিক চাপের কারণে জনগণ অকৃষি খাতের পেশায় নিয়োজিত হতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। পারিবারিক ঐতিহ্য এক্ষেত্রে কোনো বাধা হচ্ছে না।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ব্র্যাককেয়ার যৌথভাবে এ বিষয়ের উপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছে যে জনগণের শিল্পখাতে নিয়োজিত হওয়ার আগ্রহ সবচেয়ে বেশি।

৮। প্রচুর দক্ষ ও আধা-দক্ষ জনশক্তি ও বস্তুগত সম্পদের সরবরাহ

শিল্পায়নের সম্ভাবনা যাচাইয়ে দেখা গেছে যে, আমাদের দেশে প্রচুর দক্ষ ও আধা-দক্ষ জনশক্তির সরবরাহ রয়েছে। শিল্প বিকাশের জন্য প্রচুর জনশক্তি কৃষিকাজে নিয়োজিত জনশক্তির বাইরে হতে নিয়োগ করা সম্ভব। এ ছাড়া শিল্পে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও অন্যান্য বস্তুগত সম্পদের সরবরাহ থেকে অনেক কৃষি উৎপাদনভিত্তিক কাঁচামাল শিল্পের জন্য যোগান দেয়ার সুবিধা বর্তমান আছে।

৯। অকৃষি খাতে শ্রম বিনিয়োগের আগ্রহ

কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় এদেশের প্রয়োজনাতিরিক্ত শ্রমিক কৃষিক্ষেত্রে নিয়োজিত। ফলে মানুষের গড় মাথাপিছু আয় কম। শিল্পোদ্যোগ বিকাশের মাধ্যমে প্রয়োজনাতিরিক্ত কৃষিশ্রমিক শিল্পক্ষেত্রে স্থানান্তর করে কার্যক্ষেত্রে গতিশীলতা (Dynamism) আনয়ন করা সম্ভব। এ ছাড়া দেশের প্রাথমিক শিল্প কৃষিতে সারা বছর শ্রমিক নিয়োজিত থাকে না বলে কৃষি মৌসুম বাদে অন্য সময় অকৃষি কর্মে নিয়োজিত থাকলে মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

১০। কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় এদেশে কৃষিজাত পণ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ প্রচুর পাওয়া যায়। ফলে কৃষিজাত পণ্যের ও প্রাকৃতিক সম্পদের যথার্থ ব্যবহারের লক্ষ্যে শিল্প স্থাপন করলে শিল্প ও কৃষিক্ষেত্রে উন্নতি সাধিত হবে।

১১। কারিগরি ও পেশাভিত্তিক শিক্ষার প্রসার

দেশে এখন প্রচুর কারিগরি ও পেশাভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান হতে বেশিরভাগ শিক্ষিত যুবক-যুবতী চাকরিতে না গিয়ে যে কোন হাতের কাজ ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োজন এমন কোন পেশা বা ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপনে এগিয়ে আসে। সাধারণ শিক্ষার সাথে কারিগরি ও পেশাভিত্তিক শিক্ষার যত বিকাশ ঘটবে শিল্পোদ্যোগ প্রসারের সম্ভাবনা তত বৃদ্ধি পাবে।

১২। উদার শিল্পনীতি

শিল্পকারখানার বিস্তার ঘটানোর লক্ষ্যে বর্তমানে সরকার উদার শিল্পনীতি ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া সহজ শর্তে ঋণ দান, ব্যাংকের সুদের হার হ্রাসকরণ, শিল্প স্থাপনে বিধিবদ্ধ নিয়মকানুনের শিথিলকরণের ফলে দেশের মানুষের মধ্যে শিল্পোদ্যোগ চেতনা বিস্তার লাভ করছে। এ ছাড়া পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাগুলোতে পল্লী উন্নয়ন ও কৃষিভিত্তিক স্থাপনের উপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

১৩। বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক গ্যাস

জলবিদ্যুৎ ও থারম্যাস বিদ্যুৎ এবং প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কারের ফলে বাংলাদেশে শিল্পোদ্যোগ বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যে কোন শিল্প ও ব্যবসায় উদ্যোগ স্থাপনে শক্তি সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৪। স্বাধীন জীবনযাপনের আগ্রহ বিস্তার

বেকার সমস্যা ও চাকরির মধ্যে পরাধীন থাকার বিড়ম্বনাসহ নানা কারণে মানুষের মধ্যে স্বাধীনভাবে কাজ করে বেঁচে থাকার প্রতি আগ্রহ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে কোন স্বাধীন পেশা আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে সম্মানজনক কাজ বলে বর্তমানে বিবেচিত হবে। ফলে স্বাধীন জীবনযাপনের আগ্রহ থেকে উদ্যোক্তার বিকাশ লাভ ঘটছে।

১৫। উন্নয়নমূলক সংগঠনের প্রতি বেকার যুবকদের আগ্রহ বৃদ্ধি

দেশে শিক্ষিত, আধাশিক্ষিত ও অশিক্ষিত বেকার যুবক- যুবতীদের জন্য বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য নানা সংগঠন কাজ করছে। এসব কার্যক্রম প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দানের কর্মসূচিতে বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করছে এবং আত্মকর্মসংস্থানের প্রতি উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। দেশে এখন সেলাই, রান্না, ড্রাইভিং শিক্ষা, পোল্ট্রিফার্ম, মাছ চাষ, কমিউনিটি সেন্টার স্থাপন, চিকিৎসা কেন্দ্র পরিচালনা, নার্সিং শিক্ষা বিস্তার ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিপুল জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ব্যবসায় উদ্যোগ বিস্তারে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।

আরও পড়ুন>>> 

Related Guideline

মেগার কি কত প্রকার মেগারের গঠন ও কার্যপ্রণালী

মেগার কি? কত প্রকার? মেগারের গঠন ও কার্যপ্রণালী

আমরা যে সকল বিষয়ে আলোচনা করব তা হল:-  মেগার কি? কাকে বলে? মেগার কত প্রকার ও কি কি? মেগারের গঠন ও কার্যপ্রণালী। মেগারের ব্যবহার। মেগার ভালো না খারাপ তা কিভাবে পরিক্ষা করা হয়? কিভাবে মেগার দ্বারা উচ্চ রেজিস্ট্যান্স পরিমাপ করতে হয়? ইত্যাদি বিষয়।

Full Guideline »

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Enable Notifications    OK No thanks